হাওজা নিউজ এজেন্সি: হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমীন আহমদ ফার্খফাল-এর সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি:
প্রশ্ন: ইমাম রেজা (আ.)-এর জীবনাচরণ থেকে আমরা মূলত কী শিক্ষা পাই?
হুজ্জাতুল ইসলাম ফার্খফাল: ইমাম রেজা (আ.) স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন—দীন ও রাজনীতি কখনো আলাদা নয়। তিনি মাআমুনের সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে প্রমাণ করেছেন, ইসলামি সমাজকে রক্ষা করতে হলে নেতৃত্ব ও ইমামতের দুর্গ অটুট রাখতে হবে। ইরানি জাতি আজও সেই সীরাত থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও শক্তি ওলায়াত ও নেতৃত্বের আনুগত্যের মধ্যেই খুঁজে পাচ্ছে।
প্রশ্ন: সে সময় মুসলিম সমাজে কী অবস্থা বিরাজ করছিল?
হুজ্জাতুল ইসলাম ফার্খফাল: সমাজ ছিল বিভক্ত। নানা মত ও দলে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল মুসলিম উম্মাহ। এমনকি শিয়াদের মধ্যেও উমাইয়া, মারওয়ান ও আব্বাসীয় ষড়যন্ত্রের কারণে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছিল। ঠিক এই কঠিন পরিস্থিতিতেই ইমাম রেজা (আ.) দৃঢ় নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছিলেন।
প্রশ্ন: আব্বাসীয় শাসক মামুন ইমামকে উচ্চ পদে বসাতে চেয়েছিলেন কেন?
হুজ্জাতুল ইসলাম ফার্খফাল: মাআমুনের উদ্দেশ্য ছিল দ্বিমুখী। একদিকে বিরোধীদের চুপ করানো, অন্যদিকে শিয়াদের মাঝে ইমামের অবস্থান দুর্বল করা। কিন্তু ইমাম রেজা (আ.) তাঁর দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন। জীবনের শেষ প্রহরে তিনি ঘনিষ্ঠজনদের বলেছিলেন: “আল্লাহ আমাকে এ তাগুতের হাত থেকে রক্ষা করুন।”
প্রশ্ন: কোনো ঘটনার মাধ্যমে কি তাঁর ন্যায়পরায়ণ অবস্থান প্রকাশ পেয়েছিল?
হুজ্জাতুল ইসলাম ফার্খফাল: অবশ্যই। মামুনের সভায় একবার একজন বৃদ্ধকে চুরির অভিযোগে আনা হয়েছিল। সে বলেছিল, ক্ষুধার তাড়নায় রুটি নিয়েছিল। মামুন রায় দিলেন, তার হাত কেটে ফেলা হবে। তখন বৃদ্ধ প্রতিবাদ করে বলেছিল: “যদি চোরের হাত কাটা উচিত হয়, তবে প্রথমে তোমার হাত কাটা উচিত। কারণ তুমি সবচেয়ে বড় ডাকাত—খিলাফত ও নেতৃত্ব আহলে বাইতের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছ।”
মামুন ক্ষুব্ধ হয়ে ইমাম রেজা (আ.)-র দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো: “ইবনে রাসূলুল্লাহ! এ লোক কী বলছে?” ইমাম শান্তভাবে জবাব দিলেন: “সে তাই বলছে, যা তুমি নিজেই শুনেছ।”
এই উত্তর মামুনকে স্পষ্ট করে দেয় যে, ইমাম কখনোই তার অবিচারকে বৈধতা দেবেন না। তখনই সে বিষ প্রয়োগ করে ইমামকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রশ্ন: কেউ কেউ বলেন, মামুনের দেওয়া ওয়ালিয়ে-আহদ গ্রহণ মানে আত্মসমর্পণ। আপনার মত কী?
হুজ্জাতুল ইসলাম ফার্খফাল: এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ইমাম নিজ ইচ্ছায় নয়, জোরপ্রয়োগে এই পদ গ্রহণ করেছিলেন। মামুন বিপুল সৈন্য পাঠিয়ে তাঁকে মদিনা থেকে বের করে আনে। বিদায়ের সময় ইমাম পরিবারকে বলেছিলেন: “আমি তোমাদের কান্নার শব্দ শুনতে চাই ।”—এটি প্রমাণ করে, তিনি বাধ্য হয়েই এ পদ গ্রহণ করেছিলেন।
প্রায় দুই বছর মামুন তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। শেষ পর্যন্ত বিষ প্রয়োগেই তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
প্রশ্ন: ইমাম রেজা (আ.)-এর এই সীরাত থেকে আমাদের সমাজ কী শিক্ষা নিতে পারে?
হুজ্জাতুল ইসলাম ফার্খফাল: সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্রের মুখে নীরব থাকা চলবে না। দ্বীন থেকে রাজনীতি আলাদা নয়, রাজনীতি থেকেও দীন বিচ্ছিন্ন নয়। ইমাম রেজা (আ.) বারবার বলেছেন, বেলায়েতই সমাজের নিরাপদ দূর্গ। এটি ভেঙে গেলে মুসলিম উম্মাহ শত্রুর কবলে পড়বে।
প্রশ্ন:এ শিক্ষার প্রতিফলন আমরা আজকের বিশ্বে কোথায় দেখতে পাচ্ছি?
হুজ্জাতুল ইসলাম ফার্খফাল: এর প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিরোধে। তারা বহু নেতা ও যোদ্ধাকে হারিয়েও শত্রুর মোকাবিলা করছে। বিপরীতে, বহু মুসলিম দেশ তাদের সেনাবাহিনী ও ভূমি শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছে।
আজও আমাদের দায়িত্ব হলো বেলায়েত আঁকড়ে ধরা। ইমাম খোমেনীর (রহ.) আদর্শের উত্তরসূরি হিসেবে আজ এই দায়িত্ব পালন করছেন ইমাম খামেনেয়ী (হাফিজাহুল্লাহ)।
প্রশ্ন: তাহলে ইমাম রেজা (আ.)-এর শাহাদাত দিবসে আমাদের অঙ্গীকার কী হওয়া উচিত?
হুজ্জাতুল ইসলাম ফার্খফাল: আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—ইসলাম, বিপ্লব ও দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ় থাকা। শত্রুর সব ষড়যন্ত্র ইতিহাসের আবর্জনায় নিক্ষেপ করাই হবে ইমাম রেজা (আ.)-এর সীরাত থেকে নেওয়া প্রকৃত শিক্ষা।
আপনার কমেন্ট